Rebirth

BMV-41/1 লুবধি থেকে শান্তির যাত্রাপথের এক বাস্তব পুনর্জন্মের কাহিনী (প্রথম ভাগ)

১৯০২ সাল ৮ই জানুয়ারী, মথুরা শহরে বাবা শেখর শর্মা ও মা বিমল শর্মা (আসল নাম চতুর্ভুজ) তাঁরা এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন নাম লুবধি।তখনকার সময়ে এমনিতেই অল্পবয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত তাই সেই বিয়ের এই অধ্যায় থেকে লুবধি ও বাদ পড়েনি। মাত্র দশ বছর বয়সে লুবধির বিয়ে হয় মথুরারই এক কাপড়ের ব্যবসায়ীর সাথে আর স্বামীর নাম কেদারনাথ চৌবে বয়সে অনেকটাই বড় লুবধির থেকে।

লুবধি শারীরিক ভাবে পুর্নতা পায়নি তখনও মাত্র বারো বছর বয়সে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়। সন্তান জন্ম দেন ঠিকই কিন্তু মা ও সন্তানের যমে মানুষের লড়াইয়ে সন্তান মারা যায় আর লুবধি টানা নয় দিন দীর্ঘ জীবন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।ঠিক এর থেকে আরো কয়েক বছর পর লুবধি আবারও অন্তঃসত্ত্বা হন।এবারে লুবধির মা বাবা স্থানীয় হাসপাতালের উপর ভরসা না করে অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে নিয়ে যান আগ্রাতে এক নামী সরকারি হাসপাতালে।

২৫শে সেপ্টেম্বর ১৯২৫ সাল আগ্রার এক সরকারী হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লুবধি এক সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।কিন্তু এই সময়ে লুবধির নিজের শারীরিক অবস্থা দিন কে দিন খারাপ হতে থাকে হাসপাতালে,আর ঠিক নয় দিনের মাথায় ডাক্তারদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ও লুবধিকে বাঁচানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর এই সময়ের মধ্যে লুবধি মাত্র একবারই তার সন্তানকে দেখতে পান।মা ও সন্তানকে একে অপরের থেকে আলাদা রাখা হয়।

ডাক্তার লুবধিকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।লুবধি ছিল তাঁর স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী প্রথম স্ত্রী বহু আগেই মারা যান।কাহিনীর প্রথম ভাগটা ছিল আর পাঁচটা মানুষের সাথে যা হয়ে থাকে প্রায় একই রকম।মা হারা লুবধির পুত্রসন্তান বাবার আদরে বড় হতে থাকে,আর লুবধির বর আবারও বিয়ে করেন। যদিও উনি লুবধিকে মারা যাওয়ার আগে কথা দিয়েছিলেন যে আর কোনোদিন জীবনে বিয়ে করবেন না।শেষমেশ সেই কথাও রাখেননি।

লুবধি মারা গেছেন ঠিক একবছর দশ মাস সাত দিন হয়ে গেছে।ঠিক এরই পরে ১১ঐ ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে দিল্লীরই এক অধিবাসী বাবুরঙ বাহাদুর মাথুরের ঘরে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয় ও ভদ্রলোক মেয়ের নাম রাখেন শান্তি দেবী। জন্ম থেকেই মেয়ে চুপচাপ, কোনো কথা বলে না।মা বাবা ভাবলেন হয়তো তাঁদের এই কন্যাসন্তান টি কোনরকম শারীরিক সমস্যা নিয়েই জন্মেছে, তাই ডাক্তার করিরাজ অনেকই করিয়েছেন কিছুই ফল হয়নি।সমস্ত ডাক্তারি রিপোর্ট ও যথেষ্ট ভালো।মেয়ের মা বাবার ও মানসিক অবস্থা ভালো নয় তাঁরা নিজেরাও মর্মাহত মেয়ের কিছু বিদঘুটে আচরণে।

ঈশ্বরের কাছে একটাই আর্জি হে ঈশ্বর সন্তান তো দিলে তবে এত অসুস্থ কেন দিলে, কবে আমাদের মেয়ে মুখ খুলবে?শান্তির বয়স যখন চার বছর হটাৎ ই মা বাবা দেখেন মেয়ে কি যেন বলেই চলেছে কিন্ত ভাষা বোঝার উপায় নেই।স্থানীয় এক পাড়ার লোক সেই ভাষা বুঝতে পারেন ওটা মথুরার ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের গ্রাম্য ভাষা, যেহেতু কোনো একটা সময়ে উনি নিজেও সেখানে থাকতেন, তাই ভাষাটা তাঁর জানা আছে।

শান্তির মা বাবার এক পরম আনন্দ যাক মেয়ে কথা তো বলছে, এতকাল তো সে মুখই খোলেনি।কিন্তু মেয়েটি যে সমস্ত অপ্রাসঙ্গিক কথা প্রায়শই বলে একটা চার বছরের মেয়ের মুখে যেকোনো মা বাবার ক্ষেত্রে শোনার জন্য অভ্যস্ত নয়।আর মেয়েটিই বা বড়দের মত এত পরিপক্ব কথা কি করে বলে জন্মের পর কেউ তো তাকে শেখান নি।

তাই উপায়ান্তর না দেখে তারা মেয়েকে নিয়ে ছোটেন দিল্লীর মনোবিদ এক ডাক্তারের কাছে। হয়তো সন্তান মানসিক রোগগ্রস্ত তাই ডাক্তার দেখালে ঠিক হয়ে যাবে।ডাক্তার দেখলেন তার সমস্ত আগের জীবনের কথা শুনলেনও তাই মেয়ের মা বাবাকে ডাক্তার জানালেন আপনার মেয়ে অসুস্থ নয়, পুরোটাই সুস্থ।তবে ও যেটা বলছে সেটা ওর নিজেরই পুনর্জন্ম থেকে। ভারতবর্ষে এমন ঘটনা হয়তো এটাই প্রথম, আপনাদের মেনে নিতে হবে। মেয়ে শান্তি একদিন এলাকার সেই পরিচিত বাসিন্দাকে নিয়ে মা বাবাকে বেশ গম্ভীর আর বিশ্বাসের চোখে আসল সত্যি টা বলেই ফেলেন যে সে বিবাহিত তার স্বামী আছে উনি থাকেন মথুরা নগরীতে এমনকি তার একটা পুত্র সন্তান ও আছে।

এটা শোনাতে উনারাও স্তম্ভিত ও ভীত ,একটা চার বছরের মেয়ে কি করে এত ভুলভাল কথা বলে আর কথার সত্যতাই বা কত।ইতিমধ্যে শান্তি কিছুটা বড় হয়েছে তাই তাঁর বাবা ডাক্তারের পরামর্শে ঠিক করলেন মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দেবেন আর পাঁচ দশটা বাচ্চাদের সাথে মিশলে হয়তো মনের উদ্ভট এই চিন্তা শক্তি ও মানসিক বিকার গুলো কেটে যাবে। শান্তি স্কুলে গিয়ে বন্ধুবান্ধবদের কাছে এক উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠে কারণ শান্তির ভাষা কোনো বন্ধুই বোঝে না, সে যে মথুরানগরীর গ্রাম্য ভাষা বলে।

মা বাবাকে সে এর আগেও বহুবার বলেছে তাকে একবার অন্তত মথুরানগরী তে নিয়ে যায় তার কল্পনার স্বামীর ঘরে।কিন্ত কেউই কর্ণপাত করেননি শান্তির কথায় আর করবেনই বা কেন? তাই একদিন শান্তি সকলের কথা উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় যদিও ধরা পড়ে যায় দিল্লীর বাসস্ট্যান্ডে। শান্তির নিজের চেষ্টায় আর মথুরায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি।মনমরা হয়ে বসে থাকে সারাটাক্ষণ।

এতক্ষণে মা বাবা কিছুটা হলেও মেয়ের কাছে হার স্বীকার করে আর স্বামীর নাম,কেমন দেখতে ,শরীরে এমন কোনো চিহ্ন যা দেখে অনায়াসে চেনা যায়, মেয়ের শ্বশুর বাড়ির ঠিকানা, শ্বশুরবাড়ির অন্দরমহল সমস্ত কথা শান্তিকে জিজ্ঞাসা করে।শান্তি তাঁর শ্বশুরবাড়ির সমস্ত কথারই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেই শুধু স্বামীর নাম বাদ দিয়ে।

শান্তি জানায় মথুরাতে তার বাড়ি ঠিক কেদারনাথ মন্দিরের পাশেই।বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই একটা কুয়ো যেখানে সে নিজে প্রতিদিন স্নান করতো। মারা যাওয়ার আগে সে কিছু টাকা লুকিয়ে রেখেছিল স্বামী যেন জানতে না পারেন বাড়ির পশ্চিম দিকের একটা গর্তে।টাকার অঙ্কটা খুচরো পয়সা মিলিয়ে একেবারে দেড়শো টাকা। মন্দিরের পাশেই স্বামীর কাপড়ের দোকান। এমনকি বাড়িতে কে কে আছেন তাঁদের নাম ও সম্পর্কের কথা সেটাও বলেন বিস্তারিত।

এদিকে শান্তির মা বাবা নাছোড়বান্দা বলতেই হবে তোকে তোর স্বামীর নাম তবেই তোকে মথুরা শহরে নিয়ে যাবো। শান্তি লজ্জিত মা বাবার কাছে নাম প্রকাশে ,একটা সময় বলেই ফেলে আমাদের মথুরাতে একটা রীতি রেওয়াজ আছে যে স্বামীর নাম নিতে নেই কি করে নেই?শান্তির মা একথা শুনে তো অবাক এইটুকু মেয়ে কি করে এত নিয়মকানুন জানে।দিল্লিতে শান্তির বাবার এক নিকটাত্মীয় থাকেন নাম বাবুবিসান চাঁদ। মেয়ের এই আজগুবি কাহিনির বিস্তারিত আলোচনা করেন ও তাঁকে জানান।

উনি দিল্লিতেই দারিয়াগঞ্জের এক নামকরা রামযশ স্কুলের শিক্ষক।সমস্ত ঘটনা শুনে উনি শান্তির বাবাকে বলেন যেন মেয়েকে নিয়ে একবার অন্তত উনার কাছে আসে।কথামত মেয়েকে নিয়ে উনি যান তাঁর কাছে তাঁকেও শান্তি ঠিক হবহু একই কথা বলে যেটা তার মা বাবাকে বলেছে আগে।

স্বামীর নাম জিজ্ঞাসা করাতে সে তো লজ্জায় বলবেই না। তখন বাবুবিসান চাঁদ শান্তি কে আশ্বস্ত করেন নাম যদি না বলো তাহলে তো আমরা এগোতেই পারবো না তুমি ঠিক বলছো নাকি ভুল বলছো।তবে হ্যাঁ কথা দিলাম নাম বললে আমি নিজেই তোমায় সঙ্গে করে মথুরায় নিয়ে যাবো।

শান্তি হয়তো কিছুটা ভরসা করেন বাবুবিসান চাঁদকে কিন্ত বলেন বলতে পারি সেটা ও একান্তে গোপনে। রীতি রেওয়াজ নিয়ে শান্তি যে একেবারেই গোড়া সেটা বাবুবিসান চাঁদ নিজেও অবাক তাও আবার এতটুকু মেয়ের পক্ষে।তাই তিনি ঘটনার পর্যবেক্ষণে নিজেও বেশ তৎপর হন, আসল সত্যিটা বার করতেই হবে।

সমন্ত ঘটনার বিবরণ শুনে বাবুবিসান চাঁদ শান্তির শ্বশুর বাড়িতে চিঠি পাঠান ও শান্তির কথামত একটা আনুমানিক ঠিকানা লিখে উপরে স্বামীর নাম শ্রী কেদারনাথ চৌবেকে উদ্দেশ্য করে পোস্ট করেন।এমন বাস্তব ও সত্যি ঘটনা কেদারনাথ বাবুকেও চমক এনে দেয় এমনটা কোনোদিন হয় নাকি। লুবধি থেকে শান্তি শুধুই নামটা পাল্টেছে অথচ শান্তি যে সমস্ত কথা গুলো বলেছে পুরোটাই হুবহু মিলে গেছে।

তাই মনের ঐকান্তিক ইচ্ছের তাগিদে উনিও উত্তর পাঠান একই ঠিকানায় সঙ্গে শান্তির সত্যতা প্রমাণের জন্য সম্মতি জানান উনারা আসবেন দেখা করতে প্রথমে নিজে নয়, তাঁরই ভাইকে শান্তির স্বামী সাজিয়ে পাঠিয়ে দেখা যাক শান্তি চিনতে পারে কিনা যিনি যাবেন তিনি উনার স্বামী নাকি দেওর।

আসছি ঠিক এর পরের অধ্যায়ে যেটা আরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।একটা সময় মহাত্মা গান্ধী নিজেও হস্তক্ষেপ করেন ও এই বিষয়ে এক পনেরো জনের কমিশন গঠন করেন সত্যতার ইতিবৃতান্ত ও শেষ পরিণতি জানার জন্য।

ক্রমশঃ……।।

Leave a Reply

Your email address will not be published.